পরিবারের সব চেয়ে ছোট সদস্য অপু। বয়স ১১ বছর। সবেমাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। অবশ্য পড়ালেখার প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। নিজের চারপাশের পরিবেশের যা কিছু তাই নিয়েই তার আগ্রহ প্রশ্ন করা তার স্বভাব। সামনে নতুন কিছু পেলে তা নিয়েই প্রশ্ন করতে থাকবে সারাক্ষণ। স্কুল ছুটির সময়ে অপু বাবার সাথে সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে যাই। বাবা সুকান্ত কলকাতার নামকরা কলেজে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ভালো শিক্ষক হিসেবে কলেজে খুব নাম হয়েছে তার। একদিন অপু বাবার সাথে সমুদ্রের পাড়ে ঘুরতে ঘুরতে এক ধরণের পাহাড় দেখতে পেল। ঠিক যেন একটা পাথরের উপর আরেকটা পাথরের চাঁদও, তার উপর আরেকটা। এই রকম উপরি উপরি সাজানো। ঠিক সে সময় অপুর মনে প্রশ্ন এলো এবং বাবাকে প্রশ্ন করলো- বাবা, এই পাহাড়টা এমন কেন? এইটা কি ধরণের পাহাড়? এইরকম তো আগে কখনো দেখেনি?

বাবা উত্তরে বলল, এগুলোকে পাললিক পাহাড় বলে। আগে নদীগুলো যখন সমুদ্রের দিকে বয়ে চলতো তখন মাটি, ধাতু, গাছপালা, মরা জন্তু-জানোয়ার, শামুক, গুগলি এমন কতো কি বয়ে নিতে চলতো। যেখানে  স্রোত কম সেখানে এগুলো একটু একটু করে জমা হয়েছিল। এইভাবে জমতে জমতে অনেকদিন ধরে এগুলো তাকে তাকে জমা হতে লাগলো। আর, তলের দিকের তাকগুলো পরপর পাথর হতে লাগলো। এভাবেই গড়ে উঠলো পাললিক পাহাড়। এই পাহাড়ের মধ্যেই আবার ফসিল পাওয়া যায়।

ফসিল কি?

বিভিন্ন প্রাণির শরীর এই পাহাড়ের মধ্যে জমে পাথর হয়ে যায় তাই হলো ফসিল।

প্রাণির শরীর? তাতো পঁচে যাওয়ার কথা। পঁচেনা কেন?

কারণ, প্রাণির শরীর অনেক ছোট ছোট কোষ দিয়ে তৈরি। আর এই কোষগুলোও আবার অনেক অনেক ছোট প্রোটোপ্লাজম দিয়ে তৈরি। তাই এই প্রাণির শরীর যখন পাথররের

সাথে জমা হয় তখন আমদের শরীর থেকে এই প্রোটোপ্লাজম গুলো বেরিয়ে গিয়ে বিভিন্ন রকম খনিজ ঢুকে হয়ে যায় পাথরের প্রাণি। আর এই পাথরের প্রাণিরাই হলো ফসিল।

কোষ, প্রোটোপ্লাজম এগুলো কি?

কোষ হলো প্রাণিদেহের শরীরে সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশের নাম। শুধু প্রাণিদেহ নয়। জগতের সমস্ত কিছুই কোষ দিয়ে তৈরি। ওই যে বললাম এই কোষগুলোও প্রোটোপ্লাজম দিয়ে তৈরি। এই প্রোটোপ্লাজম তৈরির সাথে-সাথেই পৃথিবীতে প্রাণের চিহ্ন দেখা দিয়েছে। তবে তা আজকের বাঘ, হাতি, ঘোড়া কিংবা মানুষ নয়। আসলে পৃথিবীতে প্রথম যে প্রাণি দেখা দিল তার নাম হচ্ছে অ্যামিবা। যা এই বিন্দু বিন্দু প্রোটোপ্লাজমের সমন্বয়ে গঠিত একটিমাত্র কোষ। তবে আরেকটা মজার বিষয় হচ্ছে এই প্রোটোপ্লাজমও আবার অনেক অনেক উপাদান দিয়ে তৈরি। তার মধ্যে প্রধান হল কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন যা পৃথিবী সৃষ্টির সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এছাড়াও আরো অনেক মৌলিক জিনিস রয়েছে।

তাহলে কি পৃথিবীর প্রথম প্রাণি অ্যামিবা?

হ্যাঁ এই এককোষী জীব অ্যামিবা। এই অ্যামিবা বাইরে থেকে নিজের জন্য খাবার যোগায় এবং হজম করে। সেই খাবারের পুষ্টিতে এদের শরীর বাড়ে। আর এভাবে হয়ে যায় এককোষী থেকে দু-কোষ, তিনকোষ, বহুকোষ। আর এই বহুকোষী প্রাণিরাই নানানভাবে বদলাতে বদলাতে আজ এতো লক্ষ লক্ষ প্রাণি হয়ে গেছে।

তার মানে আজকের সকল প্রাণি এই অ্যামিবা থেকেই সৃষ্টি? কিন্তু প্রমাণ কি?

প্রমাণের তথ্য জোগাড় করলো কে? সে এক ভারি মজার ছেলে। ঠিক তোমার মতো। তার নাম হলো চার্লস ডারউইন। ডাক্তার, পাদ্রি হবার সব ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর প্রতি কোনো মন নেই ছেলেটির। পোকা-মাকড়, পশু-পাখির প্রতিই বেশি আগ্রহ তার। পাখির ডিম খুঁজতে খুঁজতেই সারাটা দিন কেটে যায় তার । নতুন কোনো পোকা মাকড় দেখলে আনন্দে লাফিয়ে উঠে। ছেলেটির বয়স যখন ২১ বছর হল খবর এল কাল বলে একটা জাহাজ পৃথিবী জুুড়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন বললেন কেউ যদি বিজ্ঞানের খবর যোগাড় করতে আগ্রহী থাকে তাহলে তাকে জাহাজে নেয়া হবে। ছেলেটি অনেক কষ্টে বাবাকে রাজি করিয়ে জাহাজ ক্যাপ্টেনের সােেথ দেখা করতে গেল। ডারউইনের থ্যাবড়া নাক। ক্যাপ্টেন ভাবলো, ওর দ্বারা কিছু হবেনা। তবে শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেনেরও মন গললো। সবাই যাকে দেখে বললো ওর দ্বারা কিছু হবেনা, তাকে দ্বারাই হয়ে গেলো। এমন হলো যে, পুরো পৃথিবীতে হৈচৈ পড়ে গেলো।কিন্তু কিভাবে?

জাহাজটি যখন এদেশ থেকে ওদেশ, এ দ্বীপ থেকে ওদ্বীপ করে পাঁচ বছর হয়ে যায় ডারউইন তখন নানান গাছপালা পশুপাখি আর পাহাড়-পর্বত সংক্রান্ত তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখে রাখে। তারপর আরো বিশ বছর ডারউইন জন্তু-জানোয়ার, পশুপাখি, গাছপালা, পাহাড়-পর্বত দেখার পর এমন একটি বই বের করলো, যা মানুষের পূর্বের ধারণা একদম ভূল প্রমাণ করে দিলো। এর আগে পর্যন্ত মানুষ ভাবতো জগতের যা কিছু সব ঈশ্বরের সৃষ্টি। হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ব্যাঙ, মানুষ সবকিছুই আলাদা করে সৃষ্টি করা। কিন্তু, আসলে তা নয়। আমরা বাইরে থেকে দেখলে যদিও বা মিল দেখতে পাইনা, ভিতরে কিন্তু এদের সবার গঠন এক। আমরা যদি এদের সবার কঙ্কাল একসাথে দেখি তাহলে অনেকখানি একইরকম দেখতে পাব। সব কঙ্কালের গঠনই একইরকম। কঙ্কালে কঙ্কালে যেন ভাই ভাই। তার মানে প্রমাণ হয় আমাদের সবার আদিপ্রাণী একই ছিলো। আর এই আদিপ্রাণিটি মাছ। অনেক অনেক বছর ধরে এই মাছজাতীয় প্রাণিরাই বদলাতে বদলাতে লক্ষ লক্ষ প্রাণি হয়ে গিয়েছে। মাছরাই হলো পৃথিবীর প্রথম শির দাঁড়ওয়ালা প্রাণি। এরাই নানান দিকে বদলাতে বদলাতে ব্যাঙ, খরগোশ, গন্ডার, বাঁদর, শিম্পাঞ্জী থেকে শুরু করে মানুষ হয়েছে। তার মানে এদের সবার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। কারো সম্পর্ক একটু কাছের আবার কারো সম্পর্ক একটু দূরের। যেমন, মানুষের সাথে গন্ডারের দূূরের সম্পর্ক। কিন্তু গন্ডারের সােেথ শুয়োরের সম্পর্ক অনেক কাছের, আর মানুষের সাথে শিম্পাঞ্জীর সম্পর্কও অনেক কাছের। আসলে যে সব প্রাণিদের পূর্বপুরুষ এক, যাদের সম্পর্ক বেশ কাছের তারা যখন মায়ের পেটের মধ্যে থাকে তখন তাদের চেহারার মধ্যে আশ্চর্য মিল থাকে। এর থেকেই প্রমাণ হয়, আজকের সকল প্রাণির আদিপ্রাণি বা পূর্বপুরুষ একই। আর এই পূর্বপুরুষটি ওই মাছ। কিন্তু এই মাছ বা এলো কোথা থেকে? প্রথমেইতো সেই ক্ষুদে প্রাণি। পুরো শরীরটাই একটা কোষ দিয়ে গড়া। তারপর কোষের বৃদ্ধি হতে হতে হয়ে গেলো বহুকোষী প্রাণি। তাদের নাম দেয়া হল ট্রাইলোবাইট। প্রায় বিশ কোটি বছর ধরে জলের মধ্যে এদেরই রাজত্ব। এদের কেউ একদম জলের উপর, আর কেউ একদম জলের তলার কাঁদায়।। জল থেকে এরা সহজেই খাবার যোগাড় করতে পারে। গায়ের উপর পুরু একটা খোলস। তাই অল্প বিপদে এরা মরেনা। এরা প্রচুর বাচ্চা পারে, কিন্তু প্রায়ই মারা যায়। তবে বংশরক্ষা হয়। আজকের দিনেও এদের বংশধর পৃথিবীতে টিকে রয়েছে। যেমন-কাঁকড়া, বিছে, শামুক, কেঁচো, মাকড়শা ইত্যাদি।

 

কিন্তু বিশ কোটি বছর পর ট্রাইলোবাইটদেও বংশ শেষ পর্যন্ত লোপ পায়। ঠিক তখনই আবার নতুন ধরণের প্রাণি গড়ে উঠতে লাগলো। যাদের নাম দেয়া হলো অষ্ট্রাকোডার্ম। এদের মুখগুলো ছুঁচালো মতো। চোয়াল ছিলনা তাই চিবিয়ে খেতে পারেনা। কাঁদার মধ্যে ছুঁচালো মুখ ঢুকিয়ে খাবার শুষে খায়। কিন্তু এদের মধ্যে একটা দরকারি জিনিস ছিলো। সেই জিনিসটা হলো মগজ। প্রায় সাতকোটি বছর ধরে এদের একদল বংশধর শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলো আসল খাঁটি মাছ। এই মাছদের শরীরে মগজ ছাড়াও আরো নানান দরকারি জিনিস ছিলো। যেমন- একটি শিড়দাঁড়া। মাছরাই প্রথম পৃথিবীর শিড়দাঁড়ওয়ালা প্রাণি। মুখের মধ্যে চোয়াল থাকায় চিবিয়ে খেতে শিখলো। গায়ে পাখনা থাকায়, লেজ থাকায় সেগুলো নেড়ে নেড়ে জলের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে শিখলো। দেখতে দেখতে সমুদ্র ভরে গেলো মাছে মাছে। তারপর প্রায় পাঁচ কোটি বছর ধরে জলের বুকে মাছদেরই একচেটিয়া রাজত্ব। যখন থেকে পৃথিবীতে মাছের যুগ শুরু হয়েছে তখন থেকেই ডাঙ্গার উপর সবুজের চিহ্ন দেখা দিয়েছে। যেভাবে মাছের উৎপত্তি হয়েছিলো সেভাবেই। অনেকগুলো কোষ পাকিয়ে একটা শরীর গড়ে উঠলোএবং তা বদলাতে বদলাতে জলের তলায় দেখা দিলো শ্যাওলা আর ডাঙ্গার উপর সবুজ ঘাস। এখান থেকেই আজকালকার এত প্রকার গাছগাছড়ার সৃষ্টি। ডাঙ্গার উপর জীবজন্তু দেখা দিয়েছে অনেক পরে। সর্বপ্রথম ডাঙ্গার উপর যেসব প্রাণি দেখা দিলো তারা মাছদেরই বংশধর। তারা হলো উভচর। খানিকটা জীবন জলের মধ্যে আর খানিকটা ডাঙ্গার উপর। পুরোপুরি ডাঙ্গার জীব বলা যায়না। তার মানে জলেও চলে, স্থলেও চলে। যেমন, আজকালকার ব্যাঙ। এরা জলের মায়া ছাড়তে পারেনি এদের নরম তুলতুলে ডিম এর কারণে। ডাঙ্গায় ডিম পারলে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই জলে না গিয়ে কোনো উপায় নেই। যদি পারো ব্যাঙ এর ডিম সংগ্রহ কওে দেখো। জলের মধ্যে না থাকলে  স্রেফ নষ্ট হয়ে যাবে। তার মানে মাছদেরই একদল বংশধর বদলাতে বদলাতে উভচর হয়ে গিয়েছে। তারপর জলের মধ্যেও থাকতে পারে, ডাঙ্গার মধ্যেও থাকতে পারে। তারপর এই উভচরদেরই একদল বংশধর বদলাতে বদলাতে হয়ে গেলো সরীসৃপ। এরা পুরোপুরি ডাঙ্গার জীব। উভচররা যা পারেনি সরীসৃপরা তা পারল। তারাই পারলো জলের মায়া কাটিয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসতে। কারণ, এই যে এদের ডিমের উপর শক্ত খোলস, উভচরদের মতো নরম তুলতুলে নয়। তাই ডিম পারার জন্য আর জলে ফিরে যেতে হয়না। এদেও সুবিধা আরো বেড়ে গেলো। ঘোরাফেরা করা, নিশ্বাস নেওয়া নানান রকম সুবিধা। দেখতে দেখতে অনেক রকম সরীসৃপের উৎপত্তি হতে থাকলো। এদেও কারোর পা গুলো খুবই মজবুত। দিব্যি হেঁটে বেড়ায়। কারোর বুক থেকে একদম পায়ের চিহ্ন মুছে গেল। আবার কারো শরীরে গজালো চামড়ার ডানা। এইসব সরীসৃপরা চামড়ার ডানা নিয়ে আকাশে উড়তে শুরু করলো। তবে আজকালকার পাখিরা এই সব সরীসৃপদের বংশধর নয়। কিন্তু অন্য এক রকম সরীসৃপদের বংশধর। তবে, এত এতরকম সরীসৃপদের মধ্যে যাদের নিয়ে এত জমকালো গল্প তাদের নাম হলো ডাইনোসর। এদের চেয়ে বড় প্রাণি আর পৃথিবীতে জন্মায়নি। আজকের হাতিগুলো এদের সাথে ছেলেমানুষের মতো। একরকম ডাইনোসরের নাম হলো টিরেনেসাস। লম্বায় ১৯ ফুট, সামনে পা ’দুটো থামের মত। দাঁতগুলো মূলার মত। পৃথিবীতে এরাই ছিলো সবচেয়ে বিরাট মাংসখেকো প্রাণি। ডাইনোসরদের মধ্যেও আবার নিরামিষ এবং আমিষ খেকো রয়েছে। তবে এই ডাইনোসররা আমিষ খায়। এরা যখন শিকারে বের হয় তখন অন্যসব বড় বড় ডাইনোসররাও ভয়ে কম্পামান থাকে। তবে এমন বড় দৈত্যর মত হলেও এরা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে পারেনি। শুধু পড়ে রইল এদের কিছু কঙ্কাল ও কিছু ফসিল। কিন্তু কেন? কেন টিকে থাকতে পারলোনা?

প্রায়, ছ‘কোটি বছর আগেকার কথা পৃথিবীতে শুরু হলো এক রসাতল-তলাতল কান্ড। মস্ত মস্ত জলাভূমিগুলো শুকিয়ে যেতে লাগলো। মাথা তুলে দাঁড়াতে লাগলো বিরাট বিরাট পাহাড়ের চুঁড়া। উত্তর দিক থেকে বয়তে শুরু করলো শুকনো আর ঠান্ডা হাওয়া। সেই হাওয়ায় মরে যেতে লাগলো গরম জায়গার গাছপালাগুলো। পুরো পৃথিবীর চেহারাটাই বদলে যেতে লাগল। ডাইনোসররা বাঁচতো ভিজে আর গরম হাওয়ায়। তাই নতুন পৃথিবীর সাথে এরা আর খাপ খাওয়াতে পারলনা। এভাবেই শেষ হয়ে গেলো সরীসৃপদেও যুগ। তারপর?

এদিকে ইতোমধ্যেই সরীসৃপদের একদল বংশধর বদলাতে বদলাতে নতুন এক ধরণের প্রাণি হয়ে গিয়েছে। এরা দেখতে ছোট, তবুও ওই দৈত্যকার ডাইনোসরদের সাথে জ্ঞাতি সম্পর্ক। এরা হলো স্তন্যপায়ী। এদের গা‘গুলো লোমে ঢাকা,আর এদের রক্তকে বলা হয় গরম রক্ত। স্তন্যপায়ীদের আগে পৃথিবীতে যতরকম জন্তু-জানোয়ার তাদের সবার রক্তই ঠান্ডা রক্ত ছিল। এমন কি ওই বিরাট ডাইনোসর এরাও তাই। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে ঠান্ডা রক্তের চেয়ে গরম রক্তই উপযোগী। তাই পৃথিবীতে যখন রসাতল-তলাতল কান্ড শুরু হলো তখন ওই স্তন্যপায়ীর দল বেঁচে গেলো। আর এদের বেলায়ই শেষ হলো ডিম পারবার যুগ। ডিম পাড়ার বদলে শুরু হলো একেবারে তৈরি বাচ্চা পাড়ার ব্যবস্থা। ডিম পাড়ার জন্য রয়েছে নানান হাঙ্গামা। ডিম পাড়ার জায়গা নির্বাচন, ডিম পাড়ার পর সেগুলো দেখাশুনা করা, নিয়মমতো তা দেওয়া, তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানো। বাচ্চা ফোটার পর তাদেও জন্য খাবার তৈরি করা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু স্তন্যপায়ীদের বেলায় এতটা হাঙ্গামা নেই। এদের মায়ের শরীরে রয়েছে বাচ্চাদের জন্য দুধ তৈরি হবার ব্যবস্থা। সেই দুধ খেয়েই বাচ্চারা বড় হয়। তবে, সর্বপ্রথম যে সব স্তন্যপায়ীরা দেখা দিল তাদের চেহারাটা নেহাতই তুচ্ছ। কিন্তু, এদের শরীরে বিভিনড়ব রকম সুবিধা বলেই দেখতে দেখতে পৃথিবী জুড়েই এদের দাপট শুরু হলো। বদলাতে বদলাতে হয়ে গেলো আকাশের বাঁদুড়, ডাঙায় সিংহ,হাতি বাঘ, ভাল্লুক, জিরাফ ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, স্তন্যপায়ীদের একদল বংশধর গাছের ডালে বাসা বাঁধলো। এই বংশধরদের নাম দেওয়া হয় প্রামমেট। সেই সব প্রাইমেট যাদের একদল বংশধর হল বনমানুষ। আজকের পৃথিবীতে এদের আর খোঁজ পাওয়া যায়না। এইসব বনমানুষের আড্ডা ছিলো গাছের উপর। তাদের গায়ে লোম, মুখে লোম, পিছনে লেজ আর চারটি করে পা। কিন্তু গাছে গাছে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এই চারটি পায়ের মধ্যে খানিকটা তফাৎ দেখা দিল। কেননা গাছে থাকতে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরা থেকে শুরু করে, ফলমূল যোগাড় করা, ফলমূল মুখে পোড়া সবকিছুর ব্যাপারে পিছনের পায়ের থেকে সামনের পা জোড়ার কাজ অনেক বেশি। আর তাই এভাবেই সামনের পা-জোড়া বদলে যেতে থাকে। তারপর আবার এদের মধ্যে একদল বনমানুষ গাছের বাসা ছেড়ে নেমে এলো সমান জমির উপর। তারপর তারা শিখলো চার-পা ছেড়ে দু‘পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে। সে অনেক আগের কথা। প্রায় লাখ দশেক আগে। পৃথিবীর চেহেরাটা আবার নানান রসাতল কান্ডে বদলে যেতে

লাগলো। যেমন, আজকের এই ভারত মহাসাগর, তার নিচে একদিন ছিল অনেক বড় মহাদেশ। ছিলো বড় বড় বন-জঙ্গল। দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলো সেই বন-জঙ্গল। ভূমিকম্পের ফলে ধসে গিয়োছিলো মাটির নিচে। পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেলো অনেক বড় বড় বন জঙ্গল। আর, তাই বাধ্য হয়ে গাছের বাসা ছেড়ে নেমে আসতে হলো সেই বনমানুষের দলকে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখার পর তাদের সামনের পা-জোড়া আরো বদলাতে লাগলো। এভাবে অনেক বংশ পেরিয়ে ওই পা-জোড়া বদলাতে বদলাতে একদম হাত হয়ে গেলো। বনমানুষেরা আর বনমানুষ রইল না। বনমানুষ থেকে বন শব্দটি মুছে গিয়ে হয়ে গেলো মানুষ। আমরা যে মানুষ হয়েছি আমাদের এই হাতের গুণেই। একমাত্র আমাদের হাত দিয়েই হাতিয়ার বানানো যায়। অন্যান্য প্রাণির হাত দিয়েই হয়তো কোনো কিছু আঁকড়ে ধরা য়ায়। কিন্তু, হাতিয়ার বানানো যায়না। হাতের গুণেই হাতিয়ার আর হাতিয়ারের গুণেই হয়েছে মানুষ। তাই, মানুষ হয়ে গেলো সৃষ্টির সেরা জীব। আর এর প্রধান কারণ মানুষের মগজের উনড়বতি। মগজটাও অনেক বড়। যতোসব বড় বড় প্রাণি এদের সবার থেকে মানুষের মগজটাই বেশি বড় এবং উনড়বত। তার কারণ, ওই হাত, ওই হাতিয়ার। আসলে শরীরের নিয়মই এই যে, তার মধ্যে কোনো একটা অঙ্গ বাদ দিয়ে বাকি অঙ্গগুলো নিজে নিজে আলাদাভাবে বদলাতে পারেনা। আর, মানুষের শরীর সব অঙ্গের সমন্বয়ে বদলাতে বদলাতে শেষ পর্যন্ত আজকের মানুষের চেহারার মতো হলো।

অপু শুনতে পাচ্ছো?

অনেক্ষণ পরে বাবা জিজ্ঞেস করলো।

হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি। বেশ মজার লাগছে। ছিলো ক্ষুদে জীব, হয়ে গেলো মাছ। ছিলো মাছ, হয়ে গেলো উভচর। ছিলো উভচর, হয়ে গেলো সরীসৃপ। সরীসৃপ হয়ে গেলো আবার স্তন্যপায়ী । আবার ছিলো বনমানুষ,হয়ে গেলো শুধু মানুষ। এর চেয়ে মজার ব্যাপারতো আর হতে পারেনা।

এর মধ্যে অপু বাবার সাথে হোটেলে পৌঁছে গিয়েছে। সাগরের বেশ কাছেই হোটেলটি। অপু জনালার পাশে বসে সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে। এই সমুদ্র থেকেইতো জগতের সমস্ত কিছুর সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ সমুদ্রে একটি বিরাট আকারের মাছ ঢেউয়ের সাথে লাফ দিয়ে উঠলো।

 

 

লেখকঃ হাসু দেওয়ান, শিক্ষার্থী

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়